August 16, 2026, 6:41 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
লাল-সবুজের ক্রিকেট ইতিহাসে যোগ হলো আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ডারউইনের বাইশ গজে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে ৫৭ রানের ব্যবধানে হারিয়ে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে থাকা বাংলাদেশের এই জয় শুধু ম্যাচ জয় নয়, দেশের ক্রিকেটের অন্যতম বড় অর্জন।
চার দিনজুড়েই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের হাতে। শুরু থেকেই পেসারদের দুর্দান্ত বোলিং এবং পরে ব্যাটারদের দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখে। শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকদের সব প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় বাংলাদেশের জন্য বরাবরই কঠিন চ্যালেঞ্জ। ২৩ বছর আগে ডারউইন ও কেয়ার্নসে সফরে গিয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। দুই দশকেরও বেশি সময় পর দ্বিতীয়বার অস্ট্রেলিয়া সফরে এসে এবার সেই ইতিহাস বদলে দিল লাল-সবুজের দল।
শুরুতেই বোলারদের দাপট
১৩ আগস্ট শুরু হওয়া টেস্টের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের পেসাররা ম্যাচের গতিপথ অনেকটা নির্ধারণ করে দেন। দুই সেশনেরও বেশি সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপের ওপর চলে বোলারদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ২০০ রানের আগেই অলআউট হয়ে যায় স্বাগতিকরা।
অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণ—মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউড—বাংলাদেশের ব্যাটারদের একইভাবে চাপে ফেলবে, এমনটাই ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু মাঠে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশের ব্যাটাররাও দারুণ দৃঢ়তা দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ সামলে নেন।
তানজিদ হাসান তামিম তুলে নেন ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি। নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজের অর্ধশতকও বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেয়। টপ ও মিডল অর্ডারের পাশাপাশি টেলএন্ডারদের কার্যকর অবদানে শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানের লিড নেয় বাংলাদেশ—বিদেশের মাটিতে প্রথম ইনিংসে যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ লিড।
দ্বিতীয় ইনিংসেও অস্ট্রেলিয়া চাপে
বড় লিডের বোঝা নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া। শুরুতেই আবার আঘাত হানেন বাংলাদেশের পেসার হাসান। তার জোড়া আঘাতে স্বাগতিক ব্যাটিংয়ে ফের চাপ তৈরি হয়।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে প্রথম ইনিংসে স্টিভ স্মিথ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। গ্রিন দেশের মাটিতে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে লিড এনে দেন। তবে বাংলাদেশের স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজের কার্যকর বোলিংয়ে সেই লিড বড় হতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্যও থেকে যায় নাগালের মধ্যেই।
৫৭ রানের লক্ষ্য, ইতিহাসের হাতছানি
জয়ের জন্য মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পায় বাংলাদেশ। অবশ্য রান তাড়ায় শুরুতেই ধাক্কা খায় দলটি। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান তামিম এবার কোনো রান না করেই ফিরে যান।
তবে সেই ধাক্কা সামলে নেন সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। দুজনের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে আর কোনো বিপদ হতে দেননি তারা। অনায়াসেই জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।
এর আগে প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে বাংলাদেশকে অলআউট করেছিল অস্ট্রেলিয়া। সেই ম্যাচের স্মৃতি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ—কোনোটিই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারেনি।
ডারউইনে এই জয় তাই শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের ফল নয়; এটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান এবং টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের সামর্থ্যের নতুন এক ঘোষণা। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে এসে বাংলাদেশ এবার পরাজিত দল নয়, বরং ইতিহাসের বিজয়ী।